৬৪ দিনে বাংলাদেশ – “কিশোরগঞ্জ”

শেয়ার করুন

৬৪ দিনে বাংলাদেশ এর আজকের পর্বে থাকছে কিশোরগঞ্জ। কিশোরগঞ্জ বাংলাদেশের একটি জেলা যা ঢাকা বিভাগ এর অন্তর্গত। কিশোরগঞ্জের ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ২,৬৮৮ বর্গ কিলোমিটার। এই আয়তনে ১৩টি উপজেলা রয়েছে। হাওর-বাওর ও সমতলভূমির বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতির একটি বিস্তীর্ন জনপদ হলো কিশোরগঞ্জ জেলা। এ জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ, দক্ষিণে নরসিংদী, পূর্বে হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মনবাড়ীয়া এবং পশ্চিমে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলা অবস্থিত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক নিরোদচন্দ্র চৌধুরী তার ‘‘The Autobiography of an unknown Indian’’ গ্রন্থের শুরুতেই গর্ব করে লিখেছেন Kishoreganj is my birth place. লোকজ সাহিত্য সংস্কৃতিতে এ জেলার রয়েছে বিশাল ঐতিহ্য। এ জেলার লোকজ সংগীত, পালা, কীর্ত, জারী, বিয়ের প্রবাদ-প্রবচন, পুঁথি, টপ্পা, নৌকা বাইচের গান, হাস্য রসাত্মক শ্লোক, ধাঁধাঁ ইত্যাদি আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে আজও স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল রেখেছে                                                      

 

 

জেলার বিখ্যাত খাবারঃ বালিশ মিষ্টি

 

 

কিশোরগঞ্জ জেলার পুরাকীর্তিসমূহ:

১. ঐতিহাসিক জঙ্গলবাড়ী: ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী

২. ঐতিহাসিক এগারসিন্ধুর দূর্গ: ঈশা-খাঁর ঐতিহাসিক দূর্গ

৩. কবি চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির: বঙ্গের আদি মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত মন্দির

৪. দিল্লীর আখড়া: মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে প্রতিষ্ঠিত দিল্লীর আখড়া

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বঃ এ ছাড়াও এখানে জন্মেছেন দেশ বরেন্দ্র বিভিন্ন ব্যাক্তি বর্গ। তারা হলেন-

১ কবি দ্বিজ বংশীদাস-মনসা মঙ্গল কাব্যের রচয়িতা।

২ চন্দ্রাবতী-বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি রামায়নর রচয়িতা।

৩ উপেন্দ্র কিশোর রায়-শিশু সাহিত্যিক

৪ সুকুমার রায়-শিশু সাহিত্যিক

৫ মনির উদ্দীন ইউসুফ-বিখ্যাত ফার্সীগ্রন্থ শাহনামা অনুবাদক

৬ সুকুমার নন্দী-উনবিংশ শতকের প্রখ্যাত কবি ও নাট্যকার

৭ অধ্যাপক নিরোদ চন্দ্র চৌধুরী-অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও   সাহিত্যিক

৮ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম-বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ।তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্টপতি ছিলেন।

৯ মরহুম হামি উদ্দিন আহমেদ-সাবেক পূর্বপাকিস্থানের প্রথম কৃষিমন্ত্রী। ঢাকা, ময়মনসিংহ বাসরোড প্রতিষ্ঠাতা। কিশোরগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে সেচপ্রথা প্রচলনকারী

১০ মরহুম জিল্লুর রহমান-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় ৪ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন

১১ জনাব এডভোকেট আব্দুল হামিদ- মহামান্য রাষ্ট্রপতি,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

১২ কেদারনাথ মজুমদার-বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ

১৩ মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী-ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিরাট ভুমিকা পালন করেন ।

১৪ আনন্দমোহন বসু- ভারতের ছাত্র আন্দোলনের জনক।যার নামানুসারে ময়মনসিংহে আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৫ কাজী আব্দুল বারী-এ দেশের নির্যাতিত নিপীরিত কৃষক শ্রমিক মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের আজীবন সংগ্রামী রাজনৈতিক প্রবাদ পুরুষ

১৬ রেবতী মোহন বর্মণ-বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অতুর্জ্জ্বল কমিউনিস্ট বিপ্লবী কমরেড

১৭ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন-বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের নানাচিত্র অঙ্কন করে তিনি কিংবদন্তী হয়েছেন।১৯৪৭ সালে আর্টসকলেজ প্রতিষ্ঠাকরেন। যা পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনষ্টিটিউটে রুপান্তরিত হয়।

১৮ সত্যজিত রায়-ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অনন্য সাধারন প্রতিভা। অশনিসংকেত, পথেরপাঁচালি,  হীরকরাজারদেশে ছাড়াও বেশকিছু অসামান্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্র পরিচালনার কৃতিত্বসরূপ তিনি‘অস্কার’পুরস্কারেভূষিতহয়েছেন।

১৯ ইলিয়াসকাঞ্চন-ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকনন্দিত নায়ক ইলিয়াসকাঞ্চন। ২৭ বছরযাবত তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বীনায়ক হিসেবে অভিনয় করে আসছেন। এছাড়াও তিনি ‘নিরাপদসড়কচাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

২০ আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম-বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠশিল্পপতি, বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মেডিকেলকলেজ জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।

২১ ড. আলাউদ্দিন-বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইসচ্যান্সেলর।

২২ অধ্যক্ষ সারদার ঞ্জনরায়- বঙ্গের টেস্ট ক্রিকেটার

২৩ শামীম আরা নীপা-দীর্ঘদিন যাবত নৃত্যশিল্পী হিসেবে তারকাখ্যাতির সুনাম রক্ষা করে আসছেন।

২৪ রিজিয়া পারভীন-বিশিষ্ট গায়িকা।

২৫ স্বর্গীয় বিপুল ভট্রাচার্য-স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন।

২৬ ডাঃ আব্দুল আলীম চৌধুরী-শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী।

২৭ মোঃ মোজাম্মেল হোসেন-প্রধান বিচারপতি

দর্শনীয় স্থানঃ   

১। জঙ্গলবাড়ি দূর্গঃ জঙ্গলবাড়ি দূর্গ ছিল বার ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। এটি কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে করিমগঞ্জ উপজেলার কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নের জঙ্গলবাড়ি গ্রামে অবস্থিত। দূর্গের ভিতরে ঈসা খাঁ কয়েকটি স্থাপনা গড়ে তোলেন। ১৮৯৭ সালে ভুমিকম্পে দুর্গের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

২। এগারসিন্দুর দূর্গঃ এগারসিন্দুর দূর্গ পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর গ্রামে অবস্থিত। গ্রামটি ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। ইতিহাসবেত্তা আবুল ফজল রচিত আকবরনামা গ্রন্থে এই গ্রামের নাম উল্লেখ রয়েছে। এটি ছিল অহম শাসকদের রাজধানী। ১৫৩৮ সালে মুঘলরা অহমদের পরাজিত করে এ অঞ্চল দখল করে। এখানেই ১৫৮০ সালে বার ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁ মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মান সিংহকে পরাজিত করে।

৩। শোলাকিয়া ঈদগাহঃ শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্ব প্রান্তে প্রায় ৬.৬১ একর জমিতে অবস্থিত বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। প্রতিবছর এ ময়দানে ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহার নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কালের স্রোতে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানটি পরিণত হয়ে উঠেছে একটি ঐতিহাসিক স্থানে। ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত শোলাকিয়া ‘সাহেব বাড়ির’ পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসলি্লদের প্রাচুর্যতা প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করেন। আরেক মতে, সেদিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার (অর্থাৎ সোয়া লাখ) লোক জমায়েত হয়। ফলে এর নাম হয় ‘সোয়া লাখি’। পরবর্তীতে উচ্চারণের বিবর্তনে শোলাকিয়া নামটি চালু হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, মোগল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া, সেখান থেকে শোলাকিয়া। পরবর্তিতে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন।

৪। চন্দ্রাবতী মন্দিরঃ চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত প্রথম বাঙালি মহিলা কবি স্মৃতিবিজরিত শিবমন্দির। এটি কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে মাইজখাপন ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত।

৫। দিল্লীর আখড়াঃ দিল্লীর আখড়া মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নির্মিত। এটি মিঠামইন উপজেলায় অবস্থিত।

৬। মানব বাবুর বাড়িঃ মানব বাবুর বাড়ি হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে অবস্থিত। ১৯০৪ সালে জমিদারির পত্তন হলে ব্রিটিশ জেপি ওয়াইজের কাছ থেকে জমিদারি কিনে নেন গাঙ্গাটিয়ার ভূপতিনাথ চক্রবর্তী। সেখানেই তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

৭। ভীমের মায়ের চুলাঃ কিশোরগঞ্জ থানা কমপ্লেক্সের উত্তর-পশ্চিম দিকে ২০০শত মিটার দূরে। তিনদিক উঁচু মৃৎ-প্রাচীর বেষ্টিত একটি স্থাপনা যার প্রাচীরের উপরের তিনটি স্থান অপেক্ষাকৃত উঁচু। এর ভিতরের অংশ গভীর ও বাইরের তিনদিক প্রায় ২০ ফুট প্রশস্থ পরিখা বেষ্টিত। ফলে আবিস্কৃত স্থাপনাটি চুলার আকারে পরিদৃষ্ট হয়।

৮। নিকলীর বেড়িবাঁধঃ দ্বিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির বুকে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ পেতে চাইলে চলে যান নিকলী হাওরে। নিকলী হাওর কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় অবস্থিত। কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলি উপজেলার দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার।

৯। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুঃ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু বা ভৈরব ব্রীজের ঠিক পাশেই রয়েছে ১৯৩৭ সালে নির্মিত রাজা ৬ষ্ঠ জর্জ রেল সেতু, যার অন্য নাম হাবিলদার আব্দুল হালিম রেলসেতু। বর্তমানে জর্জ রেল সেতুর পাশে আরো একটি নতুন রেল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

নদ-নদীঃ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র,মেঘনা,‌কালনী, ধনু,নরসুন্দা,বাউরি।

কিভাবে যাবেনঃ মহাখালী বাস ডিপো হতে বিআরটিসি সার্ভিস (এসি)বাস পাবেন এছাও অন্যান্য বাস পাবেন। বিআরটিসি সার্ভিস (এসি)বাস-সকাল ৫.০০ টা হতে ১৫ মিনিট পরপর রাত ৮টা পর্যন্ত ছাড়ে। গোলাপবাগ মাঠ (সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এর আগে)  যাতায়াত পরিবহন ও অনন্যা সুপার এ দুটি সার্ভিস ঢাকার  গোলাপবাগ মাঠ  থেকে কিশোরগঞ্জের গাইটাল বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করে। পরিবহন দুটি ভৈরব হয়ে চলাচল করে। অন্যদিকে অনন্যা পরিবহন, উজানভাটি ইত্যাদি কিশোরগঞ্জ  থেকে পাকুন্দিয়া-মটখোলা-টোক-কাপাসিয়া-গাজিপুর হয়ে ঢাকার মহাখালী বাস ডিপো পর্যন্ত চলাচল করে। এছাড়া কিশোগঞ্জের বত্রিশ বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকার সায়েদাবাদ পর্যন্ত ঈশাঁখা পরিবহন নামে  অন্য একটি পরিবহন নিয়মিত চলাচল করছে।এছারাও ট্রেনেও যেতে পারবেন।  ঢাকার কমলাপুর রেল  স্টেশন  থেকে প্রতিদিনি সকাল ৮.০০ টায় এগারসিন্দুর প্রভাতি এক্সপ্রেস নামে একটি আন্ত:নগর  ট্রেন বুধবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিন  ছাড়া নিয়মিত চলাচল করে।

ইয়ুথ ভিলেজ/নিজস্ব প্রতিবেদক

আলোচনা করুন

avatar
  Subscribe  
Notify of