বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু

শেয়ার করুন

সত্যেন্দ্রনাথ বসু – বাঙালি সেই বিজ্ঞানী যিনি নিজে নোবেল পুরস্কার না পেলেও তাঁর “বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান”, “বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন”, বোসন কণার উপর ভিত্তি করে গবেষণা করে ১৯৮৪, ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০১ ও ২০১৩ সালে প্রায় দশজন বিজ্ঞানী পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার।

বছরের শুরুতে এই মাসেই এ মহান বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে তিনি কলকাতায় ১লা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে তিনি আইনস্টাইনের সাথে কাজ করেন। আলোর মৌলিক কণার নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামানুসারে “বোসন”। “বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান”, পদার্থের পঞ্চম অবস্থা “বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন”, “প্রাইম নম্বর থিউরি” প্রভৃতির জন্য তাঁর নাম চিরদিন স্মরণ করা হবে পদার্থবিজ্ঞান জগতে।

অত্যন্ত মেধাবী এ বিজ্ঞানী চাকরি পাওয়া কিংবা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে নানাভাবে বারবার প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়াও তখনকার সময় বিজ্ঞানবিষয়ক বই ও উপকরণ সহজলভ্য ছিল না। কিন্তু এসবে মোটেও দমে যান নি তিনি। দেশের মাটিতে বসেই তিনি একের পর এক উচ্চমানের গবেষণা করে গিয়েছেন। ১৯১৭-১৯২০ পর্যন্ত সাইয়েন্স কলেজে অধ্যাপনা করার সময় বিদেশি ভাষা শিখে মেঘনাদ সাহার সাথে যুক্তভাবে অনুবাদ করেছেন আইনস্টাইনের ‘থিউরি অব রিলেটিভিটি’।

১৯২১ সালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে এখানকার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগটিকে গড়ে তোলার কাজ করেন তিনি। এরপর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এখানে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ২৪ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ সৃষ্টিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

১৯২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অপরিসর সাধারণ ঘরে তিনি লিখেন তাঁর ‘প্ল্যাঙ্কস্ ল অ্যান্ড দি লাইট কোয়ান্টাম হাইপথেসিস’ নামক প্রবন্ধটি। উপযুক্ত মূল্যায়ন না পাওয়ায় তিনি গবেষণাপত্রটি সরাসরি পাঠান পৃথিবীখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে। আইনস্টাইন এ মেধাবী রত্নকে চিনতে ভুল করেন নি। প্রবন্ধটির গুরুত্ব বিবেচনা করে আইনস্টাইন তা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন এবং তা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পরে এটি ‘বোস-আইনস্টাইন তত্ত্ব’ নামে সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। ১৯২৪-২৬ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সময় তিনি সাক্ষাৎ করেন বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে, কাজ করেন মাদাম কুরি, ডি ব্রগলির সাথে তাঁদের গবেষণাগারে।

দেশবিভাগ আসন্ন হলে তিনি কলকাতায় ফিরে গিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন ১৯৪৫-১৯৫৬ পর্যন্ত। বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব বিষয় হলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ক্লাসের বক্তৃতা শোনার জন্য ছাত্ররা ভীড় করত। এ সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ‘অনুশীলন সমিতি’র সাথে প্রত্যক্ষ এবং আন্দোলনকারী বিপ্লবীদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখেন তিনি।

মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন এ বিজ্ঞানী। সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলেন: “যাঁরা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা হয় না, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।“

বাংলা ভাষায় যে বিজ্ঞান চর্চা করা যায় তাঁর দৃষ্টান্ত তিনি দেন ১৯৪৮ সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ গঠন করে। এখান থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা ভাষার পত্রিকা ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ এ তিনি প্রকাশ করেন বিজ্ঞান বিষয়ক মৌলিক গবেষণা নিবন্ধ। এমনকি তাঁর উৎসাহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজ্ঞান বিষয়ক বই ‘বিশ্ব পরিচয়’ লেখেন। বইটি আবার রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে।

 ১৯২৯ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের পদার্থবিজ্ঞান শাখার সভাপতি, ১৯৪৪ সালে কংগ্রেসের সভাপতি, ১৯৫৬-৫৮ শান্তিনিকেতনের উপাচার্য, ১৯৫৮ সালে রয়াল সোসাইটির ফেলো, ১৯৫৯ এ ভারতের জাতীয় অধ্যাপকসহ বহু পদ ও পদক অলংকৃত করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

ইয়ুথ ভিলেজ/নিজস্ব প্রতিবেদক/সিফাত নার্গিস

আলোচনা করুন

avatar
  Subscribe  
Notify of