ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখাকে করে তুলুন স্বতঃস্ফূর্ত

শেয়ার করুন

স্কুলে ভর্তি করানোর আগে থেকেই অভিভাবকেরা বাচ্চাদের কাছে পড়ালেখাকে একটি চাপিয়ে দেওয়া বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে যেন এটা তাদেরকে করতেই হবে দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে। এতে করে শিশুদের মনে ধারণা তৈরি হয় যে তাদেরকে পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে এবং পড়ালেখা তাদের নিজস্ব কোন কাজের মধ্যে পড়েনা। ফলস্বরুপ, তাদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি একপ্রকার অনীহা তৈরি হতে থাকে বয়সের সাথে সাথে।

বর্তমান সমাজে পড়ালেখায় সন্তানের ভালো ফলাফল করাকে অভিভাবকদের মধ্যে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয় যার ভুক্তভোগী আপনার ছেলে কিংবা মেয়েই হয়। স্কুলে ভর্তি করানোর পর অভিভাবক, সমাজ শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় অন্যের চেয়ে ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত হওয়ার প্রতিযোগিতায়। তারা সিলেবাসের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো পড়ে একের পর এক ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়, হয়তো ভালো ফলাফলও করে কিন্তু তারা বিষয়গুলো কেন পড়ছে, বিষয়গুলো থেকে আসলেই জ্ঞান অর্জন করছে কিনা, এগুলো তাদের মূল্যবোধে আদৌ কোন ভূমিকা রাখছে কিনা এই বিষয়গুলো অগোচরেই থেকে যায়। প্রায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের একটি বাহির নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ অনুভব করে যেখানে খুব কম ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ পায়। এভাবে পড়ালেখার জগতটি তাদের কাছে একটি অদৃশ্য খাঁচার মতো লাগতে থাকে যেখান থেকে তারা সবসময় মুক্তি পেতে চায়। শিক্ষাব্যবস্থায় যেকোন পরিবর্তন, নতুন কোন সংযোজন তাদের কাছে মনে হয় তাদের চিরচেনা পথের বিপরীতে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে কারণ তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই তাদের ও পড়ালেখার মাঝে নেতিবাচকতার প্রাচীর তৈরি হয়ে যায়। এই অবস্থা একদিনে তৈরি হয়না বরং আমাদের অভিভাবক ও সমাজব্যবস্থার সৃষ্ট সবার চেয়ে ভালো করার প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদেরকে এই অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। জ্ঞানার্জনের তুলনায় তাদের কাছে প্রতিটি পদক্ষেপ যেকোন মূল্যে পার হওয়াই আসল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।

মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতরে পার করে আসে কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয় উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শুরুতে কারণ তখন খুব কম ক্ষেত্রেই ধরাবাধা নিয়ম থাকে এবং শিক্ষার্থীরা তখন কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পড়ালেখা থেকে। কারণ মাধ্যমিকের পর তারা নিজেদেরকে পড়ালেখার বাঁধাধরা গন্ডি থেকে মুক্ত ভাবতে শুরু করে। এক পর্যায়ে অভিভাবকেরা বিভিন্ন ভাবে চাপ সৃষ্টি করে তাদেরকে পড়ালেখায় ফিরিয়ে আনতে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়। ফলাফলস্বরুপ মাধ্যমিক পর্যায়ের ফলাফল এর চিত্র উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়ে যায় অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই।

কিন্তু দৃশ্যপট হওয়া উচিৎ ছিলো ঠিক এর বিপরীত। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখা করাকে শিক্ষার্থীদের কাছে জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারলে তাদের মনোজগতে পড়ালেখা সম্পর্কে ইতিবাচক একটি জগৎ তৈরি হবে। তখন শিক্ষার্থীরা পড়ালেখাকে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া কোন কাজ না ভেবে অন্তর্জাত একটি টান অনুভব করবে পড়ালেখার প্রতি। এই টান যখন তৈরি হবে তখনই একমাত্র পড়ালেখার মাধ্যমে স্বাভাবিক জ্ঞান অর্জন সম্ভব হবে। ফলস্বরুপ প্রতিটি নতুন ক্লাসের পড়া, শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন কোন সংযোজন কিংবা পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মনে বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি করবেনা বরং তারা পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে শিখবে।

ভেবে দেখুন তো, স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যপটপ কিংবা অন্যান্য ডিভাইসের প্রতি আকর্ষণ কিন্তু আমাদের জোর করে তৈরি করতে হয়না। একটি শিশু যখন তার চারপাশের মানুষজনের মাঝে এই বিষয়গুলোর প্রতি আসক্তি দেখে তখন তার মাঝেও এ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হতে শুরু করে। যখন আপনি কাউকে পড়তে বাধ্য করছেন কিন্তু নিজেই স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপে ব্যস্ত, তখন তার মনোজগতে কখনোই সাচ্ছন্দ্যে বইটি নিয়ে পড়ার ইচ্ছা তৈরি হবেনা। তাদের মধ্যে পড়ার ইচ্ছা তৈরি করতে হলে আপনাকেও পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখাতে হবে এবং এটা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। আপনি যখন ছোটবেলা থেকেই কাউকে বইয়ের মধ্যে আগ্রহ খুঁজে নিতে সাহায্য করবেন, নাহোক সেটা কোন অ আ ক খ কিংবা A B C D এর বই, হতে পারে জীবজন্তুর ছবির বই কিংবা তাদের প্রিয় কার্টুন চরিত্রে্র বই তখনই সেই আগ্রহটা তার মাঝেও জন্ম নেবে। সে এই আগ্রহটাকে লালন করতে থাকবে যা একসময় পড়ালেখাকে তার কাছে স্বাভাবিক ও সাবলীল করে তুলবে।

শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়ালেখাকে সাবলীল করে তুলতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সমাজ। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়, আপনার সন্তানদের সুস্থ পরিবেশে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আপনি এই পরিবর্তনে অবদান রাখতে পারেন। শিশুদের শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তর তাদের নিজের ইচ্ছায় ও প্রচেষ্টায় পার করতে দিন। আপনি শুধু তাদের মধ্যে ইচ্ছা আর ইতিবাচক ভাবনা গড়ে তুলুন আপনার চেষ্টায় কারণ পড়ালেখায় জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য তখনই তৈরি হয় যখন সেটা স্বতঃস্ফূর্ত হয়। আপনার সন্তান কিংবা ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে ছোটবেলা থেকে সুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করুন, নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে তাদের ধারণা দিন এবং লক্ষ্য করুন তারা সেই বিষয়গুলো নিয়ে পরে আরো জানতে চাইছে কিনা। এভাবে আপনি তাদের আগ্রহের বিষয়টা খুঁজে বের করতে পারবেন। বিভিন্নভাবে তাদের মধ্যে বই পড়া ও বিভিন্ন সূত্র থেকে নিত্যনতুন জ্ঞানার্জনের প্রবণতা তৈরি করুন। তাদের ভালো ফলাফল করতে উৎসাহ দেবেন ঠিকই কিন্তু কখনোই খারাপ ফলাফলের জন্য তিরষ্কার কিংবা শাস্তি দেবেন না। কোনভাবে যদি আপনি কারো্র মধ্যে পড়ালেখার প্রতি অনীহা তৈরি করে ফেলেন তবে তা থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা দুর্বিসহ ব্যাপার। তাই এই ধরণের নেতিবাচক তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন। চাপ প্রয়োগ নয়, সুন্দর এবং ইতিবাচক শাসনের মধ্যে সন্তানকে শিক্ষা দিন, তার মধ্যে আগ্রহ তৈরি করুন শিক্ষাজীবণের শুরু থেকেই তবেই পড়ালেখা তাদের কাছে স্বতঃস্ফূর্ত হবে।

ইয়ুথ ভিলেজ/বিশেষ প্রতিবেদক/অন্তর সরকার

1
আলোচনা করুন

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
Saugata Roy Arghya Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Saugata Roy Arghya
Guest
Saugata Roy Arghya

this is a very helpful article