কাল জয়ী জহির রায়হান

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং মুক্তিসংগ্রাম – এ তিনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি নাম হল জহির রায়হান। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় যে ১০ জন প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তাঁদেরই একজন ছিলেন এই সাহসী বুদ্ধিজীবী। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাথে যুক্ত থেকে তিনি তাঁর নিজ জায়গা থেকে সরব ছিলেন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

গণঅভুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে (১৯৭০ সালে) তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র “জীবন থেকে নেয়া” মুক্তি পায়। এ ছবিতে প্রতীকী কাহিনীর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করা হয় এবং জনগণকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এ চলচ্চিত্রে “আমার সোনার বাংলা” গানটি চিত্রায়িত হয় যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। চলচ্চিত্রটি সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটকের মত প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের প্রশংসা কুড়ায়। এর প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

তাঁর এমন আরেকটি অনন্য কাজ ছিল “স্টপ জেনোসাইড (Stop Genocide)”। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাঙ্গালীদের দুর্দশা ও পাকিস্তানী বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ এতে উঠে আসে। সামরিক জান্তার গণহত্যার চিত্র সম্বলিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে জনমত গঠনে সাহায্য করে।

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯শে আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় ৩৭ বছরের জীবনে চলচ্চিত্র পরিচালক, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে রেখেছেন বিশেষ অবদান। তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস “শেষ বিকেলের মেয়ে” (১৯৬০) এবং নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র “কখনো আসেনি” (১৯৬১)।

তিনি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা “দ্য উইকলি এক্সপ্রেস” প্রকাশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এ ছাড়া তিনি কতিপয় সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

১৯৬১ সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র “কখনো আসেনি” মুক্তি পাবার পর একের পর এক তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। এসব চলচ্চিত্রের কয়েকটি হলো: সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) ইত্যাদি। কেবল পরিচালক ছাড়াও তিনি অন্যান্য মাধ্যমে আরো কিছু চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উপন্যাস- হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী, আরেক ফাল্গুন, আর কত দিন ইত্যাদি, গল্প- সময়ের প্রয়োজনে, সোনার হরিণ, নয়াপত্তন, একটি জিজ্ঞাসা ইত্যাদি।

কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। এছাড়াও তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নিগার পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর তিনি ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন। দেশে আসার পর তিনি তাঁর নিখোঁজ বড়ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু তিনিও হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান এবং ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারির পর থেকে আর কোনদিন এ মহান বুদ্ধিজীবীর খোঁজ পাওয়া যায় নি।

ইয়ুথ ভিলেজ/নিজস্ব প্রতিবেদক/সিফাত নার্গিস

আলোচনা করুন

avatar
  Subscribe  
Notify of